জনাব হাবিবুর রহমান, বিপিএম(বার), পিপিএম(বার)

ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ

জীবনী বানী পুলিশ মহাপরিদর্শক মহোদয়ের বানী

অক্টোবর 10, 2019

বিকাশ প্রতারণা মামলায় গোপালগঞ্জ জেলার সাফল্য

বিকাশ প্রতারক
ঘটনা একঃ-
কুব্বাত আলী (ছদ্দ নাম), পেশায় রাজমিস্ত্রী। আগে যেখানে কাজ করতেন সেখান থেকে পাওনা পাঁচ হাজার টাকা এসেছে তার বিকাশ একাউন্টে। লেখাপড়া তেমন জানেনা কুব্বাত আলী। টাকাটা খুব দরকার তার। বাড়িতে টাকা পাঠাতে হবে। ছেলেটার এসএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপ করতে টাকা লাগবে। ছেলে বারবার ফোন দিচ্ছে। তবে এবার ফোন এসেছে নতুন এক নম্বর থেকে। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো ভুলে তার মোবাইলে বেশি টাকা চলে গেছে। এখন তাকে টাকা ফেরৎ দিতে হবে। অশিক্ষিত কুব্বাত আলী বিকাশ থেকে কিভাবে টাকা পাঠাতে হয় তা জানেনা। সরল বিশ্বাসে বিশ্বাস করলো যে সত্যিই তার মোবাইলে বেশি টাকা এসেছে। অন্যের টাকা তার জন্য নয় এ ভেবেই ফোন কলারের কথামত বিকাশের সকল তথ্য দিয়ে দেয়। এরপর ঘটনা যা হবার তাই হলো, একাউন্ট থেকে সব টাকা নিয়ে গেলো।

ঘটনা দুইঃ-
জামেলা (ছদ্দ নাম), একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। গ্রামে বসবাস করেন। বিভিন্ন ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প থেকে ঋণ নিয়ে হাস, মুরগী ও ছাগলের খামার গড়ে তুলছেন। বিকাশে টাকা লেনদেন করেন। ঋণ তুলতে গিয়ে নিজের নাম লিখা শিখেছেন। মাইক্রো ক্রেডিট এবং এনজিওগুলোর ঋণ নিতে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষগুলো স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হয়েছে আশাতীতভাবে। জামেলার ছাগল বিক্রির টাকা আসে বিকাশের মাধ্যমে। আজও এসেছে ৩৫ হাজার টাকা। একাউন্টে ব্যালেন্স আছে ৪৪,৬১০ টাকা। অজানা মোবাইল নম্বর থেকে ফোন এসেছে। ফোন ধরতেই জানালো তিনি বিকাশ কাষ্টমার কেয়ার থেকে বলছেন। জামেলার বিকাশ একাউন্ট হ্যাক হয়েছে। এ টাকা হ্যাকাররা নিয়ে যাবে। দ্রুত টাকা অন্য একাউন্টে ট্রান্সফার করতে হবে। এজন্য বেশ কিছু তথ্য দরকার। জামেলার মোবাইলে একটি কোড নম্বর এসেছে সেই কোড নম্বর জানাতে বলে। জামেলা সরল বিশ্বাসে কোড নম্বর জানিয়ে দেয়। এরপর জামেলার বিকাশ একাউন্ট শুন্য হয়ে যায়। যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল সেই নম্বরে ফোন দিলে জানানো হয় নিরাপত্তার স্বার্থে জামেলার টাকা অন্য একাউন্টে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এখন ত্রিশ হাজার টাকা বিকাশ একাউন্টে ক্যাশ ইন করলে একসাথে ৭৪,৬১০ টাকা জামেলার একাউন্টে চলে আসবে। সহজ-সরল জামেলা আরও ৩০ হাজার টাকা তার একাউন্টে ক্যাশ ইন করে। কিন্তু দুই মিনিটের মধ্যে সে টাকাও নাই হয়ে যায়। এরপর থেকে সেই মোবাইল নম্বর বন্ধ। জামেলার সুখ স্বপ্ন মুহুর্তেই ভেঙ্গে যায় প্রতারকের প্রতারণায়।

এরকম প্রায় ৬/৭টি ঘটনার অভিযোগ জমা হয় গোপালগঞ্জ সদর থানায়। পুলিশ সুপার গোপালগঞ্জ মুহাম্মদ সাইদুর রহমান খান পিপিএম(বার) সাহেবের নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সদর সার্কেল, মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন পিপিএম এসব বিষয়ে দেখাশোনা করেন। বিষয়টি সদর থানায় সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করে তদন্তে নামেন। শুরু হয় মোবাইল টেকনোলজির চুলচেরা বিশ্লেষণ। অভিজ্ঞ ছানোয়ার হোসেন দিনরাত এ বিষয়ে গবেষণা করতে থাকেন। একটি বিষয় তাকে অবাক করে দেয়, ঘটনার সাথে জড়িত প্রতারকরা প্রায় কাছাকাছি অবস্থান এবং একই এজেন্টের নম্বর থেকে ক্যাশ আউট করছে। এবার নড়েচড়ে বসেন। সকল তথ্য-প্রমাণ হাতে নিয়ে অফিসার ফোর্স নিয়ে বের হন অভিযানে। রাত-দিন ফরিদপুর জেলার মধুখালী থানার ডুমেইন এবং রাজবাড়ী জেলার সদর থানার ভবদিয়া ও গোয়ালন্দ থানার নিলুসেকের পাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। এসময় বিকাশ প্রতারক চক্রের ৪ জন সক্রিয় সদস্য ১) রহিম শেখ(১৯), পিং- মজিবর শেখ, সাং- ডুমেইন, থানা- মধুখালী, জেলা- ফরিদপুর, ২) জাহিদ খান(৩৫), পিং- সালাম খান, ৩) সানি খান(১৯), পিং- মৃত মুসলেম, উভয় সাং- ভবদিয়া, থানা- রাজবাড়ি সদর, ৪) জাহিদ খান(৩৪), পিং- উসমান, সাং- নিলুসেকের পাড়া, থানা- গোয়ালন্দ, সর্ব জেলা- রাজবাড়িদেরকে আটক করেন। তাদের হেফাজত থেকে নগদ ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা, ১০টি মোবাইল সেট সিমসহ, ৫ টি অতিরিক্ত মোবাইল সিম ও ১ টি রাউটার উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার বিষয়ে স্বীকার করেন এবং তাদের অপরাপর সহযোগীদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন।

উদ্ধার
এ ঘটনার গোপালগঞ্জ সদর থানার মামলা নং- ১৬, তারিখ- ০৮/১০/২০১৯ খ্রিঃ, ধারা- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ২৩(২)/২৪(২)/২৬(২)/৩০(২) ও ৩৫(২) রুজু করা হয়। গ্রেফতারকৃত সকল আসামিগণ বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃকাঃবিঃ ১৬৪ ধারা মতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান এবং তাদের অন্যান্য সহযোগিদের নাম ঠিকানা প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। গোপালগঞ্জ জেলা পুলিশের এ ভালো কাজের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। মূলতঃ একটি প্রতারক চক্র বিকাশ প্রতারণাকে তাদের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। যদিও অল্প কয়েকদিন পূর্বে বিকাশ তার মোবাইল এ্যাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য নতুন এ্যাপ গুগল প্লে-স্টোরে আপলোড করেছে। তবে তার আগেই বিকাশ গ্রাহকদের লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে। গ্রাহক তার বিকাশ একাউন্টের তথ্য সরল বিশ্বাসে প্রতারকদের নিকট প্রদান করেই এসব টাকা হারিয়েছেন। বিকাশের পিন ও কোড নম্বর না জানালে এসব প্রতারকের ক্ষমতা নেই অন্যের বিকাশ একাউন্টের টাকা হাতিয়ে নেয়ার। মূলতঃ প্রতারক চক্র তাদের নিজেদের মোবাইলে অন্যের বিকাশের পিন ও কোড নিয়ে এ্যাপে যুক্ত করে এ প্রতারনার কাজ করে থাকে। ধন্যবাদ গোপালগঞ্জ জেলার সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী টিমকে।

পুনশ্চঃ ভুলেও প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে নিজের বিকাশ একাউন্টের তথ্য প্রদান করবেন না। বিকাশ কর্তৃপক্ষ কখনও তার গ্রাহকের বিকাশ একাউন্টের গোপন তথ্য জানতে চাইবে না।